জীবনের গল্প: মসির চেয়ে অসি বড়, জীবন নাটকের চেয়ে ও নাটকিয়
জীবনের গল্প: মসির চেয়ে অসি বড়
জীবনের গল্প: মসির চেয়ে অসি বড়
__________________________
১২/১৩ বছর আগের কথা।
তখন স্কুল কলেজগুলোতে ফরম ফিলআপকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বানিজ্য হতো।
অনেকে টেস্টে এলাউড না হলেও প্রভাবশালীরা এসে ফর্ম ফিলআপ করে ফেলতেন।
আমাদের কিছু সিনিয়র ভাই বহু তদবিরের পরেও ফরম ফিলআপ করতে পারছিলেন না।
সারা দিন বড় ভাইদের পিছনে ঘুর ঘুর করছিলেন।সবাই বলছে হবে,একটু ধৈর্য ধরো।
অথচ আজকেই শেষ দিন।
এজন্য সবাই চিন্তিত।
একভাই এর যথেষ্ঠ চ্যানেল আছে,কিন্তু তিনি সহ আরো কয়েকজনের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো তারা কেউই টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেননি।
আইন অমান্যের কারনে প্রিন্সিপাল স্যার বড় বড় তদবিরের পরেও কোন ক্রমেই ফর্ম ফিলআপ করতে দেবেন না।
সারা দিন উদ্বেগ উৎকন্ঠায় কারো খানাদানা নেই।
অফিসে দফায় দফায় মিটিং হলো এসব নিয়ে।
যখন মাগরিবের আজান দিচ্ছে তখন জানা গেল মিটিংএ সিদ্ধান্ত হয়েছে যারা টেস্ট দেয়নি তারা এলাউ পাবে না!
সবার মন খারাপ।অনেকেই ভেঙ্গে পড়েছেন কারন এটাই তাদের লাস্ট চান্স।মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়েছে।
প্রিন্সিপাল কঠিন দিলের মানুষ,কমিটির লোকও ভয় পান তাকে।
একে একে সবাই চলে যেতে থাকেন। সবশেষে প্রিন্সিপাল স্যার অফিস পিয়নকে নিয়ে বের হচ্ছেন।পিয়ন তাকে এগিয়ে দেবেন।কারন তার ব্যাগ ভর্তি ফরম ফিলআপের টাকা।ব্যাংকে জমা দেবেন পরদিন।
ভাইদের কষ্ট দেখে আমরাও সমব্যথী।আমরাও অনেকে বসে আছি।
যখন ঘুটঘুটে অন্ধকার অনেকেই ভাবছেন চলে যাবেন হঠাৎ আসলেন অফিসের সেই পিয়নটি।
ডাকলেন ভাইদেরকে।গলা নামিয়ে একজনের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন,কাল অফিস খোলার আগেই এখানে চলে আসবা।তোমাদের ফর্ম ফিলআপ হবে! তবে তার আগে টেস্টের প্রশ্নে পরীক্ষা হবে,দেখে দেখে ৫০ মার্ক করলেই হবে!
সবার তো বিশ্বাসই হয় না
মজা করছে না বাস্তবে বলে 🤔
সকলেই একবাক্যে জানতে চাইলেন ঘটনাটা আসলে কি?
পঞ্চাশোর্ধ্ব পিয়ন কোন ইতস্তত না করেই বলেন-
"আরে আমি ভয় লাগাই দিছি! বলছি ছেলেগুলার লাইফ শেষ।এরা খুব হার্মাদ টাইপের।কালকে এলে এরা আপনারে আগে খতম করবে,এদের হারানোর আর কিছু নাই।
ছেলেগুলো বলতেছে কালকে কলেজে তালা লাগাই দিয়ে আগুন লাগাই দিবে"
আমরা জিজ্ঞেস করলাম- তো, উনি বিশ্বাস করেছে আপনার কথা?
-- বিশ্বাস করেনি মানে?
চোখ বড় বড় করে বললেন,আমার চাকুরি জীবনে দেখা মতে
স্যার এতটা ভয় আগে কখনো পাননি।কারন আমরাতো উনার স্টাফ।কলিগদের কথা অবিশ্বাস হতে পারে কিন্তু আমাদের কথা উনি অবিশ্বাস করেন নাই কখনো!
এটাও বললেন-
কালকে অধ্যক্ষ স্যার ব্যাংকে টাকা জমা করবেন না যতক্ষন তোমাদের নাম আর টাকা না যায়।সেগুলো আমি নিয়ে যামু।
-কথাগুলো শুনে তো সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ।অনেকে প্রান ফিরে পেল।
চাপ কল থেকে ঢক ঢক করে পানি খেলো।আস্তে আস্তে সকলেই বাড়িতে গেলো।
শেষ খবর হলো ভাইয়েরা পরদিন ঈদের আমেজে পরীক্ষা দিয়ে ফর্ম ফিলআপ করলেন।
পিয়ন গিয়ে টাকা জমা করলেন।
নীতি কথা: আমরা ছোট বেলায় পড়েছি অসির চেয়ে মসি বড়।
কোন কোন সময় মসির চেয়ে অসি যে বড় হয়ে যায় এই ঘটনাই তার প্রমান।
কারন একজন কমিটি মেম্বার,ভাইস প্রিন্সিপালের চেয়েও প্রিন্সিপাল বা হেডটিচাররা অনেক সময় ব্যক্তিগত সহকারিদের অধিক আস্থায় নেন।
সরকারী মন্ত্রনালয়,হাসপাতালগুলোতে তো স্টাফ পিয়নরাই সর্বেসর্বা।
কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান।
রাজনীতিবিদদের মধ্যেও একই অবস্থা।তবে একটু ভিন্নতা আছে।
পলিটিশিয়ানরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সোর্স রাখে।
কেউ কেউ চামচাও পালেন। এরা অন্য যে কোন সহকারির চেয়েও বিপদ জনক।
নেতার জন্যেও,পাবলিকের জন্যেও।
নিজে সিনক্রিয়েট করে নিজের অপচন্দের লোকদের বিরুদ্ধে মিসগাইড করেন নেতাকে।আর সেই উদ্দেশ্যমূলক তথ্যের ভিত্তিতে নেতা তার পলিসি ঠিক করেন।
আর যে নেতার সহকারি সৎ,বিনয়ী, বিচক্ষন সেই নেতার ইমেজও তেমন।
এসব কারনে পাবলিক এই সহকারিদের ঘাটাতে চায় না,সবসময় সমীহ করে চলে।
যতটা না নেতাকে ভয় পান তারচে ভয় পান এদের।
যাই হোক- আজও মাঝে মাঝে সেই ঘটনা মনে পড়ে আর পিয়নের ব্ল্যাকমেইলিং স্কিল অনুভব করে মনে মনে হাসি।


কোন মন্তব্য নেই
please do not enter any spam link in the comment box.